
লেখকঃ সুদীপ্ত
মালি একটা আফ্রিকান দেশ। কালো মানুষের ঘনবসতি। জীবনযাত্রায় দরিদ্রতা মিশে থাকে। ছেলেমেয়েরা বর্ণবৈষম্য নিয়েই বেড়ে ওঠে পৃথিবীর বুকে। সেখানকার একঘর মুসলিম, আচার পালন করতে জীবন বাজি রাখে। জীবনের কঠিন ফ্রেমে বন্দী করে সব সুখ। সেই পরিবারটির সব থেকে ছোট ছেলে, আলাসিন ৫ ফুট পেরিয়ে ৬ ফুট ছুঁই ছুঁই। মাথার চান্দি ছিলা নামমাত্র একগাছা কোকড়া চুল। সেদিন সেটাও ছেঁটে দিয়েছে বোকা চৈনিক নাপিত। ছেলেটি বাড়িঘরের মায়া কাটিয়ে এতদূর দেশে এসেছে পড়তে। আমার সাথেই পড়ে। একসাথে যাওয়া আসা, অল্প কথায় কিছু উত্তর, কিছু প্রশ্ন। তাও আবার কিছু চাইনিজে, কিছু ইংরেজিতে। সব সময় দেখেছি ওর শান্ত চেহারায় ভয়ের ছাপ। হাটাচলায় কিসের যেন একটা কুন্ঠা। কখনও জিজ্ঞাসা করা হয়নি। নামায, মুসলিম ক্যান্টিনের খাবার, আর একটা পাঞ্জাবী গায়ে ওর সরল চলাফেরা আমাকে বলে দিত, ওর কষ্টটা আসলে অন্য জায়গায়। কোন আনন্দ নিয়ে মেতে থাকতে দেখিনি কোনদিন। এমনকি চেষ্টা করেও সফল হইনি ।
এখানে বলে নেয়া ভাল, ও আমার সহপাঠী। দুজনে একসাথে চাইনিজ শিখেছি। প্রথম পরিচয় সাংহাইতে। দুজনেই চাইনিজ সরকারের বৃত্তি পাই এবং সাংহাই থংচি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর ভাষা শিখতে হয়েছে আমাদের।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা, একসাথে বেরিয়েছি। হাটতে হাটতে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার চাইনিজ বুঝতে সমস্যা হয় বলে একজন ফ্রেঞ্চ জানা শিক্ষিকা দেয়া হল। কিন্তু তুমি পড়াশোনা করছ না, এমনকি ফ্রেঞ্চ ও বলছ না, কেন? আলাসিন যা বলল, তা শুনে আমার মনে হল ওর মত দেশপ্রেমিক হয়তো আমি চোখে দেখিনি। নেতাজী সুভাষ-চন্দ্র আমার এক আদর্শ, সূর্যসেন ছোটবেলার নায়ক, ৫২ তে দেখা সকল যোদ্ধা, ৭১ এর সকল শহীদ, আরও কত দেশপ্রেমিক। কিন্তু আলাসিন একেবারেই অন্যরকম। ওর সেদিনের ছোট্ট কথাগুলোর হুবহু বাংলা করলে এমনটি দাড়ায়-
“মালি একসময়ের ফরাসী উপনিবেশ। ফরাসীরা মালির সার্বভৌমত্ব নিয়ে যে খেলাটা খেলেছে তা কারও অজানা নয়। বদলে দিয়েছে শিকড়ের সব গন্ধ। সমাজ থেকে শুরু করে আত্মপরিচয়। সব বদলে গেছে উপনিবেশবাদের করালগ্রাসে। সে সব কালো দিনে আমার জন্ম হয়নি। লোকে বলে আমার মাতৃভাষা ফ্রেঞ্চ। আমি চুপ করে শুনি। কিন্তু কিছু বলি না। আমি জানি, আমার মাতৃভাষা ফ্রেঞ্চ না। আমি মনেপ্রাণে যে জাতিকে ঘৃণা করে এসেছি জন্মের পর থেকে, যাদের জন্যে আমার মাতৃভূমি পরাধীনতার কবলে, তাদের ভাষাকে জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে আমাদের উপর। আমার দেশের আর সবাই কত আনন্দে ফ্রেঞ্চ বলে। কিন্তু আমি বলতে গেলে কেমন জানি বিবেক নাড়া দেয়। আমি পারি না। দেশে থাকলে ওটা বাঁচার তাগিদে বলতে হতো। কিন্তু এখন আমি সেই খোলস মুক্ত। আমি আর কোনদিন ঐ ভাষায় কথা বলতে চাই না। আর কোনদিন শুনতে চাই না আমার মাতৃভাষা একটা ঔপনিবেশিক শিকড়। আমি আজীবন চেষ্টা করে যাব, যেন এই ভাষার শাসন থেকে মুক্তি পাই।”
পরে জেনেছি আলাসিনের একটা নামীদামী স্কলারশিপ হয়েছিল ফ্রাঞ্চে। সানন্দে অগ্রাহ্য করে চলে এসেছে। আমি ভাবি, আলাসিনের মত একটা অল্পবয়সী ছেলের দেশপ্রেম যদি এই হয়, আমাদের দেশের নামকরা ব্যারিস্টার, রাজনীতিবিদ, একসময়ের মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা, কিংবা মেধাবী ছাত্ররা, আজও কেন বাংলাকে মায়ের ভাষা, আর বাংলাদেশকে মাতৃভূমি হিসাবে মেনে নেয় না !!!!!
আলাসিনকে বুকের গভীর থেকে ভালবেসেছি। ও সত্যিকারের মানুষ, যে স্বাধীনতা আর মাতৃভাষার মর্ম বুঝেছে। ও সত্যিকারের মানুষ,যে নিজের মন থেকে যুদ্ধ শুরু করেছে এবং স্বপ্ন দেখেছে, তার সন্তানেরা আর কোনদিন শাসকের হাতে গড়া পুতুল হবে না। আমরা পারিনি। আমরা পারি না। আমরা অনেকেই আলাসিন হতে পারিনি। দিনের মধ্যে ছেলেটাকে যতবার দেখি, ততবার আমার ৫২ আর ৭১ সংখ্যাদুটো মনে আসে। আমি আনমনে আওড়াই মুক্তির পথ।
After the Chinese Economic Reform that was i...
In China recharge or top up your mobile phone is...